[X]
Home / ফিটনেস / নকল ডিম হুমকিতে জনস্বাস্থ্য!

নকল ডিম হুমকিতে জনস্বাস্থ্য!

ডিমেও ভেজাল! আশ্চর্য্যজনক হলেও ঘটনাটি সত্য। বর্তমানে প্রায় প্রতিদিনই ভারত থেকে আসছে বাংলাদেশে। আর কৃত্রিম এ ডিম রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে তৈরি চীনের। ক্ষতিকর এসব ডিমে সয়লাব হচ্ছে বাংলাদেশের বাজার। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘দ্য ইন্টারনেট জার্নাল অফ টক্সোকোলজি’ তে কৃত্রিম ডিম সম্পর্কে বিশ্লেষণধর্মী তথ্য ও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় এ তথ্য। প্রতিনিয়ত সীমান্ত দিয়ে জীবন বিধ্বংসী এই নকল ডিম চোরাই পথে বাংলাদেশে আসছে। আর এক ধরনের অসাধু ব্যবসায়ী ফার্মের হাঁস-মুরগির ডিমের আড়ালে বাজারজাত করছে এই নকল ডিম।

 

রাজধানীর বাজারগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে আসলের আদলে নকল ডিম। দামে কম হওয়ায় বেশি লাভের আশায় কিংবা বুঝে হোক না বুঝে হোক দোকানিরা দোকানে তুলছেন এই ডিম। এতে ক্রেতারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মারাত্মক স্বাস্থ্যহানীর ঝুঁকিতেও পড়ছেন। এ ডিম খেলে স্নায়ুতন্ত্র ও কিডনিতে সমস্যা হতে পারে। এমনকি ফুসফুসের ক্যান্সারসহ জটিল রোগের কারণও হতেও পারে এ ডিম। রাজধানীর বিমানবন্দর বাজার, খিলক্ষেত, বিশ্বরোড, নতুন বাজার, বাড্ডা, মোহাম্মাদপুর ও আদাবর থানার নবদয় হাউজিং, ঢাকাউদ্যান, বসিলা, শনিরবিল, টাউনহল, কাটাসুর, রায়ের বাজার, বিজলীমহল্লাসহ নানা মহল্লাতে নকল ডিমে ভরে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খিলক্ষেত এলাকার ইমন, একটি মুদি দোকান দেখিয়ে বলেন, কয়েকদিন আগে এই দোকানীর সঙ্গে মো. শাহীন খান নামের একজনের ডিম নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। শাহীনের অভিযোগ ছিল দোকানী তার কাছে নকল ডিম বিক্রি করেছে। প্রমাণ হিসেবে সে একটি ডিম ভাঙলে দেখা যায় ঐ ডিমের কুসুম অস্বাভাবিক লাল এবং ডিম ভাঙতেই কুসুম চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। পরে ঐ দোকানী ডিম ফেরত রাখতে বাধ্য হয়।

 

খনিজ, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ও স্নেহজাতীয় উপাদান সব মিলিয়ে সুষম খাবার হলো ডিম। প্রতিদিনের খাবার তালিকায় থাকে এই ডিম। কিন্তু এই ডিমেই ভেজাল। ২০০৪ সালে চীনে সর্বপ্রথম এই কৃত্রিম ডিম তৈরি হয়। এখন আবার ভারত হয়ে তা প্রবেশ করছে বাংলাদেশে।

 

সরেজমিনে খিলক্ষেত বাজারের ডিম সাপ্লাইকারির সঙ্গে যোগাযোগের জন্যে দোকানীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা ডিমসাপ্লাইকারির ফোন নাম্বারও দিতে নারাজ। পরে বিমাবন্দর এলাকার একজন ডিমসাপ্লাইকারির সঙ্গে যোগাযোগ করলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, আমরা বাজার দরের একটু কমে এই ডিম সাপ্লাই দিয়ে থাকি। তবে আমাদের সব ডিমই নকল নয়। দোকানগুলোতে আমরা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ নকল ডিম সাপ্লাই দিয়ে থাকি। আর বাকি ৬০ থেকে ৭০ ভাগ ডিমই আসল।

 

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর মোহাম্মাদপুর এলাকার বেশ কিছু দোকানে নিয়মিত বিক্রি করা হচ্ছে নকল ডিম। মোহাম্মাদপুরের বিজলী মহল্লা এলাকাবাসীর অভিযোগ স্থানীয় মসজিদ মার্কেটে বিক্রি করা হচ্ছে এই নকল ডিম। সোহাগ নামের স্থানীয় একজন বলেন, এই মার্কেটের প্রায় সব দোকানেই বিক্রি করা হচ্ছে নকল ডিম। এই ডিম হালকা চাপ লাগলেই ভেঙ্গে যায়। বাড্ডা এলাকার একজন ডিম বিক্রেতা হোসেন আলী। নকল ডিম বিষয়ে তিনি বলেন, এমন অভিযোগের কথা আমরাও শুনেছি। তবে আমার দোকানের ডিম একটিও নকল নয়। কারণ ফেসবুকে নিয়মিতই নকল ডিমের ব্যাপারটা আমার চোখে পড়ে। তাই ডিম নেবার সময় আমি ভালো করে বেছে বেছে ও দেখে ডিম রাখি। ঐ এলাকার আরো একজন দোকানী হৃদয় বলেন, সাধারণত বর্ষাকালে ডিমে একটু সমস্যা হয়। কুসুমগুলো ছড়িয়ে পড়ে। তার মানে এই নয় যে ডিম নকল।

 

একদিকে মুরগির মাধ্যমে ডিমে মিশে যাচ্ছে ক্ষতিকর এন্টিবায়োটিক আর স্টেরয়েড। অন্যদিকে ভারত হয়ে বাংলাদেশের বাজারে ঢুকতে শুরু করেছে এই কৃত্রিম ডিম। সরাসরি ক্যালসিয়াম, ক্লোরাইড ও কালামিন ড্রাই দিয়ে তৈরি হয় গাঢ় হলুদ রঙ্গের কুসুম। পাতলা স্বচ্ছ রাসায়নিকের আবরণ। এরপর আরো কিছু রাসায়নিকের মিশ্রনে তৈরি হচ্ছে ডিমের সাদা অংশটি। এরপর খোসায় রং করা হয় এমন কি তারপর মুরগির রক্তে ও ময়লা লাগিয়ে দেয় ডিমের উপর। এরপর খালি চোখে বোঝার কোনো উপায় থাকে না এটা আসল না নকল। তবে খালি চোখে পার্থক্য বোঝা না গেলেও বাল্বের আলোয় পার্থক্যটি পরিষ্কার বোঝা যায়। ভিতরটা ঘন কালো খোলটা তুলনামূলক হালকা।

 

কৃষি বিজ্ঞানী ফারুক-বিন ইয়ামিন জানান, অবিকল ডিমের মতো দেখতে জিনিসটি তৈরি হয় রাসায়নিকের মিশ্রনে। খাওয়ার সময়েও বোঝা যায় না এটা আসল নাকি নকল। কৃত্রিম ডিমে কোনো খাদ্যগুণ ও প্রোটিন নেই। বরং তা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।

 

মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট মর্নিং নিউজ এজেন্সিসহ বেশ কয়েকটি বিদেশি গণমাধ্যমও সম্প্রতি জানিয়েছে যে, মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াংগুনসহ ওই দেশের বিভিন্ন এলাকায় সীমান্তের চোরাপথে চীন থেকে কৃত্রিম ডিম পাচার হচ্ছে। চোরাপথে সেই ডিম ভারতসহ আশপাশের অন্যান্য দেশেও সয়লাব হয়েছে। যা দেখতে একদম হাঁস-মুরগির ডিমের মতো।

 

কীভাবে চিনবেন নকল ডিম :
কৃত্রিম ডিম অনেক বেশি ভংগুর। এর খোসা অল্প চাপেই ভেঙে যায়। এই ডিম সিদ্ধ করলে কুসুম বর্ণহীন হয়ে যায়। ভাঙার পর আসল ডিমের মতো কুসুম এক জায়গায় না থেকে খানিকটা চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় পুরো কুসুমটাই নষ্ট ডিমের মত ছড়ানো থাকে। কৃত্রিম ডিম আকারে আসল ডিমের তুলনায় সামান্য বড় এবং এর খোলস খুব মসৃণ হয়। খোসায় প্রায়ই বিন্দু বিন্দু ফুটকি দাগ দেখা যায়। রান্না করার পর এই ডিমে অনেক সময় বাজে গন্ধ হয় কিংবা গন্ধ ছাড়া থাকে। আসল কুসুমের গন্ধ পাওয়া যায় না। নকল ডিমকে সাবান বা অন্য কোন তীব্র গন্ধ যুক্ত বস্তুর সঙ্গে রাখা হয়, ডিমের মাঝে সেই গন্ধ ঢুকে যায়। রান্নার পরেও ডিম থেকে সাবানের গন্ধই পাওয়া যায়।

 

নকল ডিমের আরেকটি উল্লেখযোগ্য লক্ষণ হলো ডিম দিয়ে তৈরি খাবারে এটা ডিমের কাজ করে না। যেমন পুডিং বা কাবাবে ডিম দিলেন বাইনডার হিসাবে। কিন্তু রান্নার পর দেখবেন কাবাব ফেটে যাবে, পুডিং জমবে না।

 

নকল ডিমের আকৃতি অন্য ডিমের তুলনায় তুলনামূলক লম্বাটে ধরণের হয়ে থাকে। নকল ডিমের কুসুমের চারপাশে রাসায়নিকের পর্দা থাকে বিধায় অক্ষত কুসুম পাওয়া গেলে সেই কুসুম কাঁচা কিংবা রান্না অবস্থাতে সহজে ভাঙতে চায় না।

 

কিভাবে তৈরি হয় কৃত্রিম ডিম:
অনলাইনে এই কৃত্তিম ডিম প্রস্তুতপ্রণালীতে দেখা গেছে, নকল ডিম তৈরি করতে যে সব রাসায়নিক দ্রব্য প্রয়োজন হবে সেগুলো হল: ক্যালসিয়াম কার্বনেট, রেজিন, গ্যালেটিন, স্টার্চ, এলাম এবং আরও কিছু রাসায়নিক দ্রব্য। কুসুম ও সাদা অংশের সমন্বয়ে কৃত্রিম ডিম তৈরি করতে প্লাস্টিকের ছাঁচ ব্যবহৃত হয়। তবে তার আগে কুসম তৈরি করা হয় বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে। সরাসরি ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড ও কালারিং ডাই দিয়ে লাল বা গাঢ় হলুদ রংয়ের কুসুম তৈরি করা হয়। তার ওপর অতি পাতলা স্বচ্ছ রাসায়নিকের আবরণ তৈরি করা হয়। যাতে কুসুম ও সাদা অংশ এক না হয়ে যায়। সাদা অংশ তৈরিতে ব্যবহার হয় ক্যালসিয়াম কার্বনেট, স্টার্চ, রেজিন, জিলাটিন বা গ্যালেটিন ও এলাম। প্লাস্টিকের ছাঁচ ডিমের সাদা অংশ তৈরি করে তার মাঝখানে ডিমের কুসুম তৈরি করা হয়। শেষ ধাপে ডিমের উপরের শক্ত খোলস তৈরিতে করা হয়। এর জন্য ব্যবহার করা হয় ওয়াক্স, এর মিশনখানে ব্যবহার করা হয় প্যারাফিন, বেনজয়িক এসিড, বেকিং পাউডার, ক্যালসিয়াম কার্বাইড। সাদা অংশকে ওয়াক্সের দ্রবণে কিছুক্ষণ নাড়া-চাড়ার পর বাইরে থেকে স্বল্প তাপ প্রয়োগ করা হয়। এতেই তৈরি হয়ে যায় হুবহু ডিমের মতো দেখতে একটি বস্তু।

 

আসল থেকে নকল ডিম আলাদা করার উপায়:
কৃত্রিম ডিম অনেক বেশি ভংগুর। অল্প চাপেই তা ভেঙ্গে যায়। এ ডিম সিদ্ধ করলে এর সুম বর্ণহীন হয়ে যায়। ভাঙ্গার পর আসল ডিমের মতো কুসুম এক জায়গায় না থেকে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। কৃত্রিম ডিম আকারে আসল ডিমের তুলনায় সামান্য বড় এবং এর খোলস হয় মসৃণ।

 

আরো জানা যায়, চীনে তৈরী হওয়া এসব কৃত্রিম বা নকল ডিম তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদান ক্যালসিয়াম কার্বনেট, স্টার্চ, রেসিন, জিলেটিন মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। দীর্ঘদিন এ ধরনের ডিম খেলে স্নায়ুতন্ত্র ও কিডনিতে সমস্যা হয়। ফুসফুসের ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের কারণ এই কৃত্রিম ডিমে ব্যবহৃত ক্যালসিয়াম কার্বাইডসহ নানা রাসায়নিক পদার্থ।

Check Also

দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা দূর করতে সাহায্য করবে যাদুকরী এই পানীয়টি!

দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা দূর করতে সাহায্য করবে যাদুকরী এই পানীয়টি!   আপনার কী ঘাড়ে, জয়েন্টে, পায়ে …

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *