কিডনি রোগের লক্ষণ সম্পর্কে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কিডনি শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। এটি শরীরের রক্তকে পরিশোধন করে এবং দূষিত বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। প্রতিদিন একটি কিডনি ১২০ থেকে ১৫০ লিটার রক্ত পরিশোধ করে এবং দেড় থেকে দুই লিটার বর্জ্য প্রস্রাব হিসেবে দেহ থেকে বের করে দেয়। প্রস্রাবের মাধ্যমে প্রায় ৯৫ শতাংশ বর্জ্য বের হয়, আর বাকি বর্জ্য ঘাম, পায়খানা ও নিঃশ্বাসের মাধ্যমে দূর হয়। কিডনি থেকে পরিশোধিত রক্ত মানবদেহে শক্তি যোগায়। কিডনি সঠিকভাবে কাজ না করলে লক্ষণগুলো দ্রুত চিহ্নিত করা জরুরি।
প্রস্রাবের নালী, প্রস্রাবের থলি, প্রস্রাবের রাস্তা ও কিডনি নিয়ে এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। আর এদের কোন একটি জায়গায় কোনো সমস্যা দেখা দিলে তাই কিডনি রোগ। কিডনির রোগ রক্ত ফিল্টারের প্রক্রিয়াকে ব্যহত করে। সময়ের সাথে সাথে কিডনি রোগ বিকাশ লাভ করে এবং সেই সাথে কিডনির কার্যকারিতা হ্রাস পেতে থাকে। আজকের ব্লগে তাই জানবো কিডনি রোগের কারণ, কিডনি রোগের লক্ষণ, কিডনি রোগীর খাদ্য তালিকা, কিডনি রোগের চিকিৎসা এবং কিডনি রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কে।
পেজের সূচিপত্রঃ কিডনি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার – কিডনি রোগীর খাদ্য তালিকা
-
কিডনি রোগের কারণ
-
কিডনি রোগের লক্ষণ
-
কিডনি রোগীর খাদ্য তালিকা
-
কিডনি রোগী কি দুধ খেতে পারবে
-
কিডনি রোগী কি দই খেতে পারবে
-
কিডনি রোগের চিকিৎসা
-
কিডনি রোগের ঔষধের নাম
-
কিডনি রোগ কি ভাল হয়
-
কিডনি রোধ প্রতিরোধ
কিডনি রোগের কারণ
- কিডনি রোগের অন্যতম প্রধান কারণ ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ। রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি হলে তা কিডনির ক্ষতি করতে পারে। যার সর্বশেষ পরিণতি হলো কিডনি ড্যামেজ হয়ে যাওয়া। তাই কিডনি রোগের ঝুঁকি কমাতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই জরুরি।
- উচ্চ রক্ত চাপ সারাবিশ্বে কিডনী রোগ হওয়ার দ্বিতীয় প্রধান কারণ। যদি রোগীর ক্রমাগত উচ্চ রক্তচাপ থাকে তবে কিডনির রক্তনালীগুলো সরু হয়ে যায়। যা রক্ত প্রবাহের মাত্রা কমিয়ে দেয় এবং তখন শরীর থেকে অতিরিক্ত বর্জ্য তখন বের হতে পারে না। যদি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা না হয় তাহলে এক পর্যায়ে কিডনি নষ্টও হয়ে যেতে পারে।
- প্রতিদিন যেসব কারণে কিডনির ক্ষতি হয় তার মধ্যে অন্যতম একটি প্রধান কারণ হলে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান না করা। পর্যাপ্ত পানি পান না করার ফলে বৃক্কে রক্ত প্রবাহ কমে যায়। ফলে রক্তে দূষিত বর্জ্য জমা হতে থাকে।
- দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্রাব না করে থাকা কিডনি সমস্যার আরও একটি কারণ। পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেটের অভাবে শহরের নারী বাসিন্দারা অনেক সময়ই দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্রাব আটকে রাখেন। অনেক সময় ধরে মূত্রাশয় পূর্ণ করে রাখলে শরীরে নানা রকম সমস্যার সৃষ্টি হয়। কিডনিতে প্রস্রাবের চাপ বেড়ে যাওয়ায় সমস্যা সৃষ্টি হয়। এসব কারণেই কিডনি কর্মক্ষমতা হারায় এবং যার ফলে ডায়ালাইসিস করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
- খাবারে অধিক পরিমাণ লবণ থাকলে তা ও কিডনির জন্য ক্ষতিকর। খাবারে মিশে থাকা লবণকে পরিপাক করতে কিডনিকে অনেক বেশি সময় ব্যস্ত থাকতে হয়। কারণ লবণে থাকা সোডিয়ামের প্রায় পুরোটাই বর্জ্য হিসাবে বের করে দিতে হয়। এতে করে কিডনির উপর অনেক বেশি চাপ পড়ে।
- অতিরিক্ত পেইন কিলার বা ব্যথানাশক ওষুধ সেবন কিডনির জন্য ক্ষতিকর। এই সব ওষুধের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। যা কিডনিসহ অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জন্য ক্ষতিকর। ব্যথা নাশকের উপর নির্ভরশীলতা কিডনির কর্মক্ষমতা হ্রাস করে।
- খুব বেশি পরিমাণ অ্যালকোহল পান কিডনির জন্য খুবই ক্ষতিকর। অ্যালকোহলে নানা ধরণের টক্সিন থাকে। যা পরিশোধোন করতে কিডনির উপর অনেক চাপ পড়ে। তাই কিডনিতে নানা ধরণের সমস্যা দেখা দেয়।
- ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এটা শুধু কিডনিই নয় অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গের জন্য ও ভালো নয়। ধূমপানের জন্য কিডনির ক্ষতি সাধন হয়।
- রাতে নিয়মিত না ঘুমালে কিডনিসহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কাজ বাধাগ্রস্থ হয়। রাতে ঠিক মত না ঘুমালে কিডনির কর্মক্ষমতা কমে যায়।
কিডনি রোগের লক্ষণ
শুরুর দিকে কিডনি সমস্যার লক্ষণগুলো অতটা প্রকাশ পায় না। ধীরে ধীরে সময়ের সাথে সাথে লক্ষণগুলো আরও প্রকট হয়ে ওঠে। কিডনি রোগের কিছু লক্ষণ নিচে দেওয়া হলো
- ক্লান্তি, দুর্বলতা ও বমি বমি ভাব
- মুখ, পা, শরীর ফুলে যাওয়া
- চামড়া খসখসে হয়ে যাওয়া ও চুলকানি
- ঘন ঘন মাংস পেশিতে টান পড়া
- কোমড়ের দুই পাশে কিংবা তল পেটে ব্যথা হওয়া
- তীব্র উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেওয়া যা নিয়ন্ত্রণে আনা যায় না
- প্রস্রাবের পরিমাণে পরিবর্তন আসা। ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া অথবা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া
- প্রস্রাবের রঙে পরিবর্তন আসা, প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া, প্রশ্রাবে অতিরিক্ত ফেনা হওয়া
- অনিদ্রা, কোন কাজে মনযোগ না পাওয়া ও আগ্রহ কমে যাওয়া
- অনেক সময় শ্বাসকষ্ট হয়। কারণ কিডনি সমস্যার কারণে ফুস্ফুসে তরল জমা হয় ফলে শ্বাসকষ্ট হয়।
কিডনি রোগীর খাদ্য তালিকা
- সাইট্রাস জাতীয় ফল যেমন লেবু, কমলা, তেতুল, আমলকী, মাল্টা কম খাওয়া উচিত। তবে আপেল, পেয়ারা, নাশপাতি, তরমুজ খাওয়া যাবে।
- পালংশাক, পুঁইশাক, লালশাক, ধনেপাতা খাওয়া যাবে না। ডাটাশাক, কচুশাক খাওয়া যাবে।
- সবজির মধ্যে করলা -, চিচিঙ্গা, ঢ্যাঁড়শ, লাউ, বেগুন, মিষ্টিকুমড়া, শসা খাওয়া যাবে। শাক সবজি সেদ্ধ করে পানি ফেলে দিয়ে খাওয়া ভালো।
- অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিডযুক্ত খাবার যেমন কলিজা, শিমের বিচি, সামুদ্রিক মাছ, শুঁটকি ,মাছ খাওয়া যাবে না।
- অতিরিক্ত লবণ জাতীয় খাবার খাওয়া পরিহার করতে হবে।প্রোটিনের মাত্রা কমিয়ে দেওয়া উচিত। কিডনির কর্মক্ষমতা বুঝে প্রোটিন গ্রহন করা উচিত। রেডমিট খাওয়া কমিয়ে দেওয়া উচিত।
- পটাশিয়াম সম্বৃদ্ধ খাবার যেমন ডাবের পানি, কলা, শুকনো ফল, টমেটো প্রভৃতি কম পরিমাণে খেতে হবে।
- তরল খাবার নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। অতিরিক্ত পানিও খাওয়া যাবে না। রোগীর অবস্থা বুঝে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ১ থেকে দেড় লিটারের মতো পানি
খাওয়া যাবে।
কিডনি রোগের চিকিৎসা
কিডনি রোগের তেমন কোনো নিরাময় নেই। এর চিকিৎসা হলো কিডনি রোগের লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা। যেন জটিলতা বৃদ্ধি না পায়। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা, কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা, ডায়াবেটিস কন্ট্রোলে রাখা ও অন্যান্য জটিলতার জন্য ওষুধ দিয়ে রোগের গতি মন্থর করা হয়ে থাকে। রোগের শেষ পর্যায়ে কিডনি প্রতিস্থাপন ও ডায়ালাইসিস ছাড়া আর কোনো চিকিৎসা নেই।
কিডনি রোধ প্রতিরোধ
শুধুমাত্র নিয়ম মেনে চললেই কিডনির সমস্যা থেকে বেশিরভাগ সময় দূরে থাকা যায়। কিডনি রোগ প্রতিরোধে যেসব নিয়ম মেনে চলতে হবে সেগুলো হলো-
- উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
- স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে হবে।
- অ্যালকোহল পান থেকে বিরত থাকতে হবে।
- ধুমপান এড়িয়ে চলতে হবে।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যাথার ওষুধ খাওয়া যাবে না।
- প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
- প্রস্রাবের ইফেকশন কিডনির জন্য ক্ষতিকর। তাই এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
- পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করতে হবে।
- কম লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার খেতে হবে।
- নেফ্রাইটিস থাকলে চিকিৎসা করতে হবে।
- নিয়মিত ডাক্তারের চেকআপে থাকতে হবে।
পরিশেষে বলবো, শুধুমাত্র ওষুধই কিন্তু কিডনি সমস্যার সমাধান নয়। নিয়ম মেনে চলাই কিডনির সমস্যাকে দূরে রাখতে পারে। যেহেতু কিডনি রোগের লক্ষণ গুলো শুরুর দিকে তেমন প্রকাশ পায় না তাই আগে থেকে সতর্ক থাকতে হবে। ডায়াবেটিস, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করতে হবে।