Sastha Seba

November 24, 2024

থাইরয়েড সমস্যা: কারণ, লক্ষণ এবং কার্যকর চিকিৎসা

পৃথিবীতে প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ থাইরয়েড সমস্যা য় ভুগছেন। কিন্তু অনেকে জানেনই না যে তিনি থাইরয়েড রোগে আক্রান্ত। থাইরয়েড এর লক্ষণ সম্পর্কে অনেকেই জানে না। থাইরয়েড হরমোনের তারতম্যের জন্য নানা ধরণের শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন দেখা দেয়। সাধারণত নারীদের এই সমস্যা বেশি দেখা দেয়। শুধু নারীদেরই নয় পুরুষেরও এই সমস্যা হতে পারে। 
থাইরয়েড সমস্যা
তবে আজকাল শিশুদেরও হরমোন জনিত সমস্যা দেখা যাচ্ছে। তাই আজকের ব্লগে জানবো থাইরয়েড নিয়ে। জানবো কি কারণে থাইরয়েড হয়, থাইরয়েডের নরমাল রেঞ্জ, থাইরয়েডের সমস্যা হলে কিভাবে বুঝবেন, থাইরয়েড সমস্যার লক্ষণ, থাইরয়েডের লক্ষণ, থাইরয়েডে খাদ্যাভ্যাস, থাইরয়েডের সমস্যা দূর করার উপায়, পুরুষের থাইরয়েড হলে কি কি সমস্যা হয়, থাইরয়েড অপারেশনের পর কি কি সমস্যা হতে পারে, থাইরয়েড কমানোর উপায়। থাইরয়েড টেস্টে খরচ কতো ও থাইরয়েড রোগীর ওজন কমানোর উপায় সম্পর্কে।  
 

পেজের সূচিপত্র: থাইরয়েড সমস্যা: লক্ষণ, কারণ ও দ্রুত সমাধানের সহজ উপায় – থাইরয়েড সমস্যা থেকে মুক্তির উপায়

  • থাইরয়েড কী?

  • থাইরয়েড কি কারণে হয়?

  • থাইরয়েড এর নরমাল রেঞ্জ কতো?

  • থাইরয়েড এর লক্ষণ

  • থাইরয়েডে খাদ্যাভাস

  • থাইরয়েডে কী খেতে হবে

  • থাইরয়েড হলে যেসব খাবার খাওয়া যাবেনা

  • থাইরয়েড কমানোর উপায়

  • থাইরয়েড টেস্টে খরচ কতো?

  • থাইরয়েড রোগীর ওজন কমানোর উপায়

  • Tsh হরমোন বেড়ে গেলে কি হয়

থাইরয়েড সমস্যা কী?

থাইরয়েড মানবদেহের একটি গ্রন্থি। এটি দেখতে অনেকটা প্রজাপতির মতো। এর অবস্থান গলার মাঝখানে যা শ্বাসনালীকে আবৃত করে রাখে। এটি একটি অন্তক্ষরা গ্রন্থি। থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে T3 T4 হরমোন নিঃসৃত হয়। যা দেহের প্রায় সকল বিপাকীয় প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। থাইরয়েড রোগ হলো এমন একটি অবস্থা যে অবস্থায় থাইরয়েড গ্রন্থি সঠিক পরিমাণে হরমোন উৎপাদনে ব্যর্থ হয়।

হাইপারথাইরয়েডিজম

থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ হরমোন উৎপাদন হয়ে থাকে। থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে যদি বেশি পরিমাণ হরমোন উৎপাদন হয় তবে একে হাইপারথাইরয়েডিজম বলে। এ অবস্থায় শরীর খুব দ্রুত শক্তি খরচ করে যার ফলে
অনেক বেশি ক্লান্তি অনুভূত হয়। হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং ওজন খুব দ্রুত কমে যায়।

হাইপোথাইরয়েডিজম

আর যদি থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে কম পরিমাণে হরমোন উৎপন্ন হয় তবে তাকে হাইপোথাইরয়েডিজম বলে। এর ফলে শরীরের ওজন বৃদ্ধি পায়। ঠান্ডা তাপমাত্রা সহ্য হয় না, ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়। এবং আক্রান্ত ব্যক্তি ডিপ্রেশনে চলে যেতে পারে।

থাইরয়েড সমস্যা কি কারণে হয়?

থাইরয়েড গ্রন্থি যদি নির্দিষ্ট পরিমাণে হরমোন উৎপন্ন করতে না পারে তাহলেই ব্যক্তি থাইরয়েড রোগে আক্রান্ত হয়। হরমোন উৎপাদন করতে থাইরয়েড গ্রন্থির আয়োডিন প্রয়োজন। তাই শরীরে আয়োডিনের পরিমাণ কম থাকলে থাইরয়েড হরমোন কম উৎপন্ন হয় যার ফলে গলা ফুলে যায়। জন্মগত ত্রুটির কারণেও অনেকের থাইরয়েড হয়ে থাকে। প্রায় ৪ হাজার নবজাতকের একজনের মধ্যে থাইরয়েড গ্রন্থি অকার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিবারে
বাবা-মা কারো থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে সন্তানের মধ্যেও থাইরয়েড সমস্যা হওয়ার প্রবণতা থাকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রসব পরবর্তী অবস্থায় মহিলাদের মধ্যে প্রসবোত্তর থাইরয়েডা
টিস দেখা দেয়।

আরও পড়ুনঃ দ্রুত ওজন কমানোর উপায়

থাইরয়েড এর নরমাল রেঞ্জ কতো?

থাইরয়েডের সমস্যা আছে কি না সেটা পরীক্ষা করার জন্য TSH টেস্ট দেওয়া হয়ে থাকে। বয়সভেদে এর মাত্রা ভিন্ন হয়ে থাকে। TSH- এর পরিসীমা

শিশুদের ক্ষেত্রে

জন্ম থেকে ৪ দিন : 1-38 mlU/L

২-২০ সপ্তাহ : 1.7-1 mlU/L

২১ সপ্তাহ থেকে ২০ বছর : 0.7-63
mlU/L

প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে

২১-৫৪ বছর :  0.4-2 mlU/L

৫৫ থেকে ৮৭ বছর : 0.5-9 mlU/L

গর্ভাবস্থায়

প্রথম ট্রায়মিস্টার : 0.3-5 mlU/L

দ্বিতীয় ট্রায়মিস্টার : 0.3-6 mlU/L

তৃতীয় ট্রায়মিস্টার : 0.7-2 mlU/L

থাইরয়েড এর লক্ষণ

থাইরয়েড এর লক্ষণ

থাইরয়েডের সমস্যা পুরুষদের তুলনায় সাধারণত নারীদের বেশি হয়ে থাকে। থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি অথবা আধিক্যের জন্য শরীরে নানা রকম পরিবর্তন দেখা যায়। থাইরয়েডের সমস্যায় ভুগে থাকলে যেসব লক্ষণগুলো চোখে পড়ে সেগুলো হলো:

  • থাইরয়েডের অন্যতম প্রধান একটি লক্ষণ হচ্ছে ক্লান্তি। যেহেতু থাইরয়েড শরীরের শক্তি যোগান দেয়। তাই যদি হাইপার থাইরয়েডিজম হয় তাহলে অনেক বেশি ক্লান্তি অনুভূত হয়।
  • খুব দ্রুত ওজনে তারতম্য আসা থাইরয়েডের অন্য আরেকটি প্রধান লক্ষণ।
  • যদি হাইপার থাইরয়েডিজম হয় তাহলে ওজন খুব দ্রুত কমে যায়।
  • আর হাইপোথাইরয়েডিজমে ওজন খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
  • অনেক সময় দেখা যায় যে শীত বা ঠান্ডা না পড়লেও অনেক সহজে ঠান্ডা লেগে যায়। কারণ শরীর যথেষ্ট পরিমাণ ক্যালরি খরচ করতে পারে না যা হাইপোথাইরয়েডিজমের একটি লক্ষণ।
  • থাইরয়েডের সমস্যা হলে অনেক বেশি চুল পড়ে যেতে পারে। কারণ থাইরয়েডের সমস্যা হলে চুলের গোড়া দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • থাইরয়েডের সমস্যা হলে অনেকেই ডিপ্রেশনে চলে যায়।
  • কোন একটা বিষয় মনোযোগ দিতে পারে না এবং সহজেই কোন বিষয় ভুলে যেতে পারে। যেগুলো মানসিক ক্লান্তির একটি লক্ষণ।
  • থাইরয়েড হলে মেয়েদের ঋতুস্রাবে সমস্যা দেখা দেয়। যার ফলে ঋতুস্রাবের সময় এবং তীব্রতায় তারতম্য দেখা দেয়।

থাইরয়েডে খাদ্যাভাস

থাইরয়েড হলে খাদ্য তালিকায় কিছু কিছু পরিবর্তন আনতে হবে।

থাইরয়েডে কী খেতে হবে

  • থাইরয়েড রোগীদের সেলেনিয়াম ও জিংক সমৃদ্ধ খাবার বেশি খেতে হবে এর মধ্যে রয়েছে ব্রাজিলিয়ান নাটস, সামুদ্রিক মাছ, আখরোট, ডিম, সূর্যমুখী বীজ, মটর, কোকো পাউডার, ফ্ল্যাক্স সিড প্রভৃতি।
  • থাইরয়েড হরমোন উৎপাদনের জন্য আয়োডিন একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। তাই থাইরয়েড রোগীর খাবার তালিকায় আয়োডিনযুক্ত লবণ, সামুদ্রিক মাছ, ডিম প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
  • প্রবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার যেমন লো ফ্যাট দই খাদ্য তালিকা রাখা যেতে পারে।
  • গাঢ় সবুজ রঙের শাকসবজি থাইরয়েড রোগীর খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে। ‌
  • ভিটামিন ডি ফর্টিফায়েড খাবার, অলিভ অয়েল, নারিকেল তেল, তৈলাক্ত মাছ, কাঁচা মরিচ, গোল মরিচ গুঁড়ো খাবার তালিকায় রাখতে পারেন।
  • থাইরয়েড রোগীর অন্যতম কার্যকর একটি খাবার হচ্ছে ডাব অথবা নারিকেল। নারিকেল বিপাক প্রক্রিয়া উন্নত করতে সহায়তা করে। তাই খাবার দ্রুত হজম হয়।

থাইরয়েড হলে যেসব খাবার খাওয়া যাবেনা

কিছু কিছু খাদ্য উপাদান থাইরয়েডের কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। এদের মধ্যে রয়েছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, মিষ্টি আলু, মুলা, সয়াবিন, সয়া মিল্ক, সয়াসস, স্ট্রবেরি, পিচ, নাশপাতি, পান প্রভৃতি। এছাড়াও সিগারেট এবং অ্যালকোহল পান থাইরয়েড রোগীর জন্য ক্ষতিকর। 

তবে দু ধরনের থাইরয়েডেই প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি এবং ফলমূল খেতে হবে। সুষম খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। চা, কফি, চিনি বাদ দিয়ে দিতে পারলে ভালো। এর বদলে গ্রিন টি পান করতে পারেন।

থাইরয়েড সমস্যা: কমানোর উপায়

খাদ্যাভাসে ও জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন এনে থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে রাখা যেতে পারে। থাইরয়েডের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে সেগুলো হলো:

  • প্রক্রিয়াজাতকৃত খাবার ও জাঙ্ক ফুড খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • অগোছালো জীবনযাত্রা পরিহার করে একটা রুটিন মেনে চলতে হবে। নিয়মিত শরীরচর্চা ও এক্সারসাইজ করতে হবে। এর ফলে শরীরে হরমোনের ভারসাম্য বজায় থাকবে এবং সেই সাথে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
  • খাবার সময় নিয়ে ভালো করে চিবিয়ে খেতে হবে। যেন খুব সহজেই বিপাকক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে।
  • হরমোন নিয়ন্ত্রণে রাখতে আপেল সিডার ভিনেগার খাওয়া যেতে পারে।
  • খাদ্য তালিকায় আয়োডিন ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার রাখতে হবে।

থাইরয়েড টেস্টে খরচ কতো?

থাইরয়েডের লক্ষণগুলো দেখা গেলে অবশ্যই TSH টেস্ট করে নিতে হবে। প্রায় সব হাসপাতাল বা ডায়গনস্টিক সেন্টারেই TSH টেস্ট করা হয়ে থাকে।  হাসপাতালভেদে TSH টেস্ট করতে ৭০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। টেস্টের রেজাল্ট পেতে সর্বোচ্চ ২ থেকে ৭ দিন সময় লাগতে পারে। তবে কোন ইনফেকশন থাকলে বা অসুস্থ থাকলে থাইরয়েড টেস্ট না করানোই ভালো। এতে করে টেস্ট রেজাল্ট ভুল আসার সম্ভাবনা থাকে।

থাইরয়েড

Tsh হরমোন বেড়ে গেলে কি হয়

থাইরয়েড-স্টিমুলেটিঙ্গ হরমোন (TSH) পিটিউটারি গ্লান্ডে তৈরি হরমোন, যাদি থাইরয়েড গ্লান্ডে টি-3 ও টি-4 হরমোন প্রণালী করতে সঙ্কেত করে। TSH স্তর বেড়ে গেলে, সাধারন্য থাইরয়েডের কার্যক্ষম হারিয়। TSH স্তর বৃদ্ধি হলে, যাদি নির্ধারিত করা জায।

থাইরয়েড রোগীর ওজন কমানোর উপায়

থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে অনেকেরই ওজন বেড়ে যায়। এই ওজন ঝরাতে অনেকেরই অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। সহজ কিছু টিপস বলে দিচ্ছি যা মেনে চললে
থাইরয়েড থাকলে ওজন দ্রুত কমবে।

  • আয়োডিনযুক্ত খাবার বেশি করে খান। থাইরয়েড থাকলে শরীরে আয়োডিনের পরিমাণ বাড়লে ওজন তাড়াতাড়ি ঝরে। আয়োডিনযুক্ত খাবার যেমন-সামুদ্রিক
    মাছ
    , দুগ্ধজাত খাবার, ডিম খেতে পারেন।
  • থাইরয়েড থাকলে ওজন কমাতে এক্সারসাইজ করতে পারেন নিয়মিত। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যোগ ব্যায়াম কিংবা অ্যারোবিকও করতে পারেন।
  • থাইরয়েডে আক্রান্ত ব্যক্তির ওজন কমাতে চাইলে অবশ্যই স্ট্রেস কমাতে হবে। স্ট্রেস থাইরয়েড ফাংশনকে প্রভাবিত করে। এতে করে কর্টিসলের
    মাত্রা বেড়ে যায়। যার ফলে ওজন দ্রুত বাড়ে।
  • খাদ্য তালিকায় ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার যোগ করুন। চিনি জাতীয় খাবার কমিয়ে দিন।
  • নিয়মিত ৮ ঘন্টা ঘুমান।
  • সবচেয়ে ভালো হয় যদি কোন নিউট্রেশনিস্টের সহায়তা নিয়ে ডায়েট চার্ট তৈরি করে নিতে পারেন। তাহলে নিউট্রিশনিস থাইরয়েডের অবস্থা বুঝে আপনাকে ডায়েট চার্ট তৈরি করে দেবেন।

পরিশেষে বলবো, টেস্ট করার পর থাইরয়েড ধরা পড়লে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে সেই অনুযায়ী ওষুধ খেতে হবে এবং নিয়ম মেনে চলতে হবে। নয়তো সমস্যা বাড়তে থাকলে রোগীর অবস্থা আরও গুরুতর হতে পারে। আর এর চিকিৎসা দীর্ঘ সময়ব্যপী নিতে হয়। তাই ধৈর্য হারালে চলবে না।