Sastha Seba

November 23, 2024

নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার। নিউমোনিয়া রোগীর খাবার কি?

নিউমোনিয়া রোগের সাথে আমরা কম বেশি সবাই পরিচিত। কিন্তু পরিচিত রোগ হলেও এর ঝুঁকির পরিমাণ অনেক বেশি। সঠিক চিকিৎসা না নিলে রোগীর মৃত্যুর পর্যন্ত হতে পারে। প্রতিবছর লক্ষাধিক মানুষ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। শীতকালে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে নিউমোনিয়া আক্রান্তের হার বেড়ে যায়। শতকরা ১৪ থেকে ৩০ শতাংশ রোগী নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে প্রতি বছর।
আজকে ব্লগে জানবো নিউমোনিয়া নিয়ে। জানবো নিউমোনিয়া কি, নিউমোনিয়া কেন হয়, নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার, শিশুর নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণ, বড়দের নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার ও প্রতিকার, নবজাতকের নিউমোনিয়ার লক্ষণ, নিউমোনিয়া রোগের প্রতিকার, নিউমোনিয়া রোগীর খাবার, নিউমোনিয়ার ঔষধের নাম, বাচ্চাদের নিউমোনিয়া হলে করণীয়, নিউমোনিয়া কি ছোঁয়াচে, নিউমোনিয়া রোগের জীবাণুর নাম কি, নিউমোনিয়ার চিকিৎসা ও নিউমোনিয়ার প্রতিকার নিয়ে।

পেজের সূচীপত্রঃ নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার-নিউমোনিয়ার চিকিৎসা

  • নিউমোনিয়া কী?
  • নিউমোনিয়া কেন হয়
  • নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার
  • শিশুর নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণ
  • বড়দের নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার
  • নবজাতকের নিউমোনিয়ার লক্ষণ
  • নিউমোনিয়া রোগীর খাবার
  •  নিউমোনিয়ার ঔষধের নাম
  • বাচ্চাদের নিউমোনিয়া হলে করণীয়
  • নিউমোনিয়া কি ছোঁয়াচে
  • নিউমোনিয়া রোগের জীবাণুর নাম কি
  • নিউমোনিয়ার চিকিৎসা 
  • নিউমোনিয়া প্রতিরোধ

 

নিউমোনিয়া কী?

নিউমোনিয়া ফুসফুসের প্রদাহ জনিত একটি রোগ। এটি ছত্রাক ব্যাকটেরিয়া ভাইরাস বা অন্য কোন পরজীবী সংক্রমণে হতে পারে। নিউমোনিয়া হলে অ্যালভিওলি নামক ফুসফুসের ক্ষুদ্র বায়ুথলি প্রভাবিত হয়। এই বায়ুথলিতে তরল পুঁজ দিয়ে পূর্ণ হয়ে যায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। যার ফলে কাশি জ্বর এবং শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। নিউমোনিয়া হলে একটি আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুটি ফুস্ফুসই আক্রান্ত হয়। এর ফলে ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবং শরীরে অক্সিজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইডের স্বাভাবিক আদান-প্রদান প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। দু বছরের কম বয়সী এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের নিউমোনিয়া হলে ঝুঁকি বেশি। কারণ তাদের ইমিউন সিস্টেম অনেক দুর্বল থাকে। সাধারণত শীতকালে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

 আরও পড়ুনঃ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের উপায়

নিউমোনিয়া কেন হয়  

যখন ইমিউন সিস্টেম ফুসফুসের ছোট বাতাসের থলিতে সংক্রমনের ফলে প্রতিক্রিয়া দেখায় তখন এ থলি তরল পুঁজ দিয়ে পূর্ণ হয়ে যায়‌। এর ফলে নিউমোনিয়া হয়। বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ভাইরাস এবং ছত্রাকের সংক্রমনেও নিউমোনিয়া হতে পারে। সাধারণত রাইনোভাইরাস, রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস, হিউম্যান মেটাপনিউমো ভাইরাস প্রভৃতির সংক্রমনে নিউমোনিয়া হয়ে থাকে। স্ট্রেপ্টোকক্কাস নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমনেও নিউমোনিয়া হয়ে থাকে। ছত্রাক থেকে সৃষ্ট নিউমোনিয়ার হার অত্যন্ত কম থাকে। এছাড়াও বিভিন্ন পরজীবী থেকেও নিউমোনিয়া হতে পারে।

ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাল নিউমোনিয়ার উপসর্গগুলো প্রায় কাছাকাছি হলেও ভাইরাল নিউমোনিয়ার সংক্রমণে হালকা উপসর্গ দেখা দেয়। আর অন্যদিকে ব্যাকটেরিয়ার সৃষ্ট নিউমোনিয়ায় ফুসফুস গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।  

এগুলো ছাড়াও ইমিউন সিস্টেম যদি দুর্বল হয় তাহলে সহজেই একজন মানুষ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। সেজন্যই বয়স্ক মানুষ এবং শিশুদের নিউমোনিয়া হওয়া সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।  

ধূমপান করলে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে নিউমোনিয়া আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

এছাড়া পরিবেশ গত নানা রকমের দূষণ ও বায়ু দূষণের কারণেও নিউমোনিয়া হতে পারে।   

বিভিন্ন রকমের গুরুতর রোগ যেমন ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির নিউমোনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

 

 

নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণ

যেকোনো রোগের লক্ষণ জানা থাকলে সহজেই সময় মত সঠিক ব্যবস্থা নেয়া যায়। যদিও শুরুতে নিউমোনিয়ার লক্ষণগুলো অতটা গুরুতর ভাবে দেখা যায় না। কিন্তু আস্তে আস্তে এর লক্ষণগুলো গুরুতর হতে থাকে।

– কাশি থাকে তার সাথে হলুদ বা সবুজ রঙের কফ থাকে।

– শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

– স্বাভাবিক কাজকর্ম করার সময় এমনকি কোন কাজ না করে বিশ্রাম নেয়ার সময়ও শ্বাসকষ্ট হতে পারে।

– শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার সময় বুকে ব্যথা অনুভূত হয়।

– শরীর উচ্চ তাপমাত্রার জ্বর থাকতে পারে।

– জ্বরের সাথে সারা শরীরে ব্যথা থাকতে পারে।

– হার্টবিট অনেক দ্রুত হওয়া।

– বারবার ঠান্ডা লাগা এবং ঘাম হওয়া।

– ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব করা।

– খাবারে অরুচি চলে আসে।

– টানা তিন সপ্তাহের বেশি ধরে কাশি হয় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে কাশির সাথে রক্তপাতও হতে পারে।

– বয়স্কদের মধ্যে বিভ্রান্তি কিংবা অবসাদ চলে আসা।

– মাথাব্যথা থাকতে পারে সেই সাথে বমি বমি ভাব হতে পারে।

 

নিউমোনিয়া রোগীর খাবার

শুধুমাত্র ঘরোয়া চিকিৎসাতেই নিউমোনিয়া ভালো হয়ে যায় না। নিউমোনিয়া থেকে সুস্থ হয়ে উঠতে অবশ্যই ওষুধ সেবন করতে হবে এবং সেই সাথে সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে। নিউমোনিয়া হলে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য এসব খাবার খাওয়া উচিত সেগুলো হলো-

– নিউমোনিয়া রোগীকে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার দিতে হবে। বিভিন্ন রকমের ডাল, বাদাম, মাছ, মুরগি এগুলো প্রোটিনের বেশ ভালো উৎস। তাই ক্ষতিগ্রস্ত ফুসফুসের মেরামতের জন্য নিউমোনিয়া রোগীকে এসব প্রোটিন জাতীয় খাবার দেয়া যেতে পারে। 

– মধু নিউমোনিয়া রোগীদের জন্য খুবই উপকারী একটি খাদ্য উপাদান। একটি সর্দি কাশি এবং গলা ব্যথায় বেশ উপকার দেয়। নিউমোনিয়া হলে হালকা গরম পানিতে লেবু ও মধু যোগ করে খেলে আরাম পাওয়া যায়।

– আদা আমাদের ঘরে থাকা খুবই পরিচিত একটি মসলা। আদার অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি গুণের কারণে নিউমোনিয়ায় আদা বেশ উপকারে দেয়। গলায় এবং বুকের ব্যথা কমাতে আদা চা পান করা যেতে পারে।

– প্রোবায়োটিক হিসেবে দই খুবই পরিচিত একটি নাম। প্রোবায়োটিক নিউমোনিয়া সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়াকে বাধা প্রদান করে। তাই নিউমোনিয়া হলে দই খাওয়া যেতে পারে। এর ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। তবে কোন অবস্থাতেই ঠান্ডা দই খাওয়া যাবেনা।  

– নিউমোনিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিকে অবশ্যই হাইড্রেটেড থাকতে হবে। তাই প্রচুর পরিমাণে পান করতে হবে এবং তরল জাতীয় খাবার খেতে হবে। স্যুপ খাওয়া যেতে পারে বিভিন্ন জুস খাওয়া যেতে পারে অথবা আদা চা ও খেতে পারেন।

– নিউমোনিয়া হলে ভিটামিন সি যুক্ত খাবার খেতে হবে। কারণ ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। তাই নিউমোনিয়া হলে বেশি করে কমলা, লেবুর মতো সাইট্রাস জাতীয় ফল খেতে বলা হয়।

– হলুদ সামগ্রিকভাবে শ্বাসযন্ত্র ভালো রাখতে বেশ উপকারী। বুকে কফ জমলে হলুদ মিশ্রিত চা খেলে আরাম পাওয়া যায়। তাই নিউমোনিয়া হলে হলুদ খাওয়া যেতে পারে।

 

আর নিউমোনিয়া হলে অতিরিক্ত চিনি ও লবণযুক্ত খাবার খাওয়া যাবেনা। প্রক্রিয়াজাত এবং ডুবো তেলে ভাজা খাবার থেকে বিরত থাকতে হবে। অ্যালকোহল বা ক্যাফিন পান থেকে বিরত থাকতে হবে কারণ এগুলো শরীর ডিহাইড্রেটেড করে দেয়। মশলাদার খাবার কম খেতে হবে কারণ এতে করে এসিডিটি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

 

 

নিউমোনিয়ার চিকিৎসা

নিউমোনিয়ার জন্য কি ওষুধ খাওয়া যেতে পারে সেটা নির্ভর করে কোন ধরনের নিউমোনিয়া হয়েছে সেটার উপর।

– ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়া হলে ডাক্তাররা সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে থাকেন। ফুল কোর্স অ্যান্টিবায়োটিক অবশ্যই সঠিকভাবে নিয়ম মেনে শেষ করতে হবে।

– ভাইরাল নিউমোনিয়া বেশিদিন স্থায়ী হয় না নিজে নিজেই ঠিক হয়ে যায় এ ক্ষেত্রে সাধারণত কোন ওষুধেরও দরকার পড়ে না।

– আর রোগী যদি ছত্রাকের দ্বারা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয় তাহলে এর থেকে পরিত্রাণের জন্য ডাক্তার রোগীকে ছত্রাকের ওষুধ দিয়ে থাকেন। এর জন্য বেশ কয়েকদিন ধরে চিকিৎসা নিতে হতে পারে।

– এছাড়া রোগীর জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল দেওয়া যেতে পারে। কফ থাকলে কফের জন্য ওষুধ দেয়া হয়ে থাকে।  

– রোগীর যদি শ্বাসকষ্ট হয়ে থাকে তাহলে অক্সিজেনও দিতে হতে পারে।

 

নিউমোনিয়া প্রতিরোধ

নিউমোনিয়া প্রতিরোধে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে –

– ধূমপান বন্ধ করতে হবে।

– পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস মেনে চলতে হবে।

– শিশুদের এবং প্রাপ্তবয়স্কদের নিউমোনিয়া থেকে বাঁচতে ফ্লু ভ্যাকসিন দেয়া যেতে পারে।

– ধুলা, ধোঁয়া ও বায়ু দূষণ এড়িয়ে চলতে হবে।

– খাবার আগে ও বাইরে থেকে ফিরে ভালোভাবে সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হবে।

 

পরিশেষে বলবো, ঋতু পরিবর্তনের এই সময়টাতে বিশেষ করে হেমন্ত থেকে পুরো শীত জুড়ে নিউমোনিয়ার প্রকোপ বেড়ে যায়। তাই আগে থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। শিশু এবং বয়স্কদের দিকে বাড়তি নজর দিতে হবে এবং নিউমোনিয়ার কোন লক্ষণ দেখা গেলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। তবেই নিউমোনিয়া থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।