Sastha Seba

November 25, 2024

ফলিক অ্যাসিড: উপকারিতা, খাবারের উৎস এবং গর্ভাবস্থায় এর অপরিহার্যতা।

অন্যান্য ভিটামিনের মতোই ফলিক অ্যাসিডও মানব দেহের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটি পুষ্টি উপাদান। এটি গর্ভের শিশুর বৃদ্ধির জন্য খুবই সহায়ক ভূমিকা পালন করে। গর্ভাবস্থায় মায়ের খাবার তালিকায় ফলিক অ্যাসিড থাকা খুবই জরুরী। শুধু গর্ভাবস্থায়ই নয় মানব দেহের দৈনন্দিন কাজেও ফলিক অ্যাসিডের প্রয়োজন রয়েছে।ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট

তাই আজকের ব্লগে আমরা জানবো ফলিক অ্যাসিড সম্পর্কে। জানবো ফলিক অ্যাসিড কি, ফলিক অ্যাসিডের কাজ কি, ফলিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার, প্রেগনেন্সিতে ফলিক অ্যাসিড এবং ফলিক অ্যাসিড
ট্যাবলেট, ফলিক অ্যাসিড সিরাপ নিয়ে।

পেজের সূচিপত্রঃ ফলিক অ্যাসিড: উপকারিতা, খাবারের উৎস এবং গর্ভাবস্থায় এর অপরিহার্যতা – ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট

  • ফলিক অ্যাসিড কী?

  • ফলিক অ্যাসিডের অভাবজনিত লক্ষণ কী?

  • ফলিক অ্যাসিডের কাজ কী?

  • ফলিক অ্যাসিড সম্বৃদ্ধ খাবার

  • প্রেগনেন্সিতে ফলিক অ্যাসিড

  • ফলিক এসিড ট্যাবলেট কেন খাওয়া হয়?

  • ফলিসন ৫ ট্যাবলেট এর কাজ কি?

  • ফলিক এসিড খেলে কি অনিয়মিত মাসিক বন্ধ হয়?

  • ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট

ফলিক অ্যাসিড কী?

ভিটামিন বি৯-এর দ্রবনীয় রূপ হলো ফলিক অ্যাসিড। ভিটামিন বি৯ যখন প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়  না, কৃত্রিম বা সিনথেটিক উপায়ে ফলেটের রূপান্তর হিসেবে তখন এই ধরণটি গ্রহণ করা যেতে পারে। ভিটামিন বি৯ প্রাকৃতিক ভাবেই বিভিন্ন ফল, শাক-সবজি এবং বাদামে পাওয়া যায়। ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট হিসাবে ফার্মেসিতে কিনতে পাওয়া যায়। এছাড়াও অন্যান্য মাল্টিভিটামিনের সাথেও ফলিক অ্যাসিড যুক্ত থাকে।

প্রতিদিন একজন প্রাপ্ত বয়স্ক নারী কিংবা পুরুষের শরীরে ৪০০ মাইক্রোগ্রাম পরিমাণ ফলিক অ্যাসিডের প্রয়োজন। গর্ভবতী মা কিংবা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন এমন মায়েদের প্রতিদিন শরীরে ৫০০ থেকে ৬০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড প্রয়োজন। এমনকি যারা অ্যালকোহল পান করেন তাদেরও প্রতিদিন ফলিক অ্যাসিড গ্রহন করতে হবে। অ্যালকোহল পান করলে প্রতিদিন ৬০০ মাইক্রোগ্রাম পরিমাণ ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করতে হবে।

ফলিক অ্যাসিডের অভাবজনিত লক্ষণ কী?

ফলিক অ্যাসিডের অভাবজনিত লক্ষণ গুলো দেহে কতটা ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতি আছে তার উপর নির্ভর করে। দেহে ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতি হলে যেসব লক্ষণ দেখা যেতে পারে সেগুলো হলো

  • দুর্বলতা
  • খিটখিটে ভাব ও অবসাদ
  • ক্ষুধামন্দা
  • ওজন কমে যাওয়া
  • বিষন্নতা
  • চামড়া ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
  • চুল পড়া
  • রক্ত স্বল্পতা
  • মনোযোগের অভাব

আরও পড়ুনঃ থাইরয়েড সমস্যা: লক্ষণ, কারণ ও সমাধানের উপায়

ফলিক অ্যাসিডের কাজ কী?

ফলেট ও ফলিক অ্যাসিড মানবদেহের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। এটি আমাদের শরীরের বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

  • ফলিক অ্যাসিড ভ্রুণ, টিস্যু ও কোষের বিকাশে সহায়তা করে। এটি ভ্রুণ, শৈশব ও কৈশরে যখন মানবদেহের বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে সে সময়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান।
  • এটি শিশুর জন্মগত নানা ত্রুটি প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে।
  • ফলিক অ্যাসিড গর্ভের শিশুর নিউরাল টিউব গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
  • ফলিক অ্যাসিড ভিটামিন বি১২ এর সাথে মিলিত হয়ে লোহিত রক্ত কণিকা ও প্রোটিন তৈরিতে অংশ নেয়।
  • রক্ত শূন্যতা প্রতিরোধে সহায়তা করে।
  • মানবদেহের ডিএনএ ও আরএনএ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  • আয়রণ যেন ঠিকভাবে শরীরে কাজ করতে পারে তার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে ফলিক অ্যাসিড।
  • বার্ধক্যজনিত শ্রবণশক্তি হ্রাস প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে।
  • বেশ কিছু ক্যান্সার যেমন-কোলন ক্যান্সার, ব্রেস্ট
    ক্যান্সার, সারভাইক্যাল ক্যান্সার, স্টোমাক ক্যান্সার  প্রভৃতিতে বাধা প্রদান করে।

 

ferrous fumarate and folic acid tablet এর কাজ কি

 

ফলিক অ্যাসিড সম্বৃদ্ধ খাবার

প্রাকৃতিক ভাবেই অনেক খাবারে ফলিক অ্যাসিড থাকে, যা আমাদের দৈনন্দিন ফলিক অ্যাসিডের চাহিদা মেটাতে পারে। তাই এই খাবারগুলো খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে রয়েছে:

  • পুঁইশাক, পাট শাক, পালং শাক, কলমি শাক
  • ব্রোকলি, শিমের বিচি, ঢ্যাঁড়শ, সূর্যমুখীর বিচি
  • অ্যাস্পারাগাস, বিটরুট, বরবটি, বাঁধাকপি
  • ডিম, মসুর ডাল, সয়াবিন, চিনাবাদাম
  • কমলা, লেবু, পেঁপে, স্ট্রবেরি, অ্যাভোকাডো
  • গাজর, টমেটো, আলু, মিষ্টি আলু
  • সামুদ্রিক মাছ (সালমন, টুনা), ঝিনুক
  • গরুর কলিজা, মুরগির কলিজা
  • ছোলা, সাদা মটরশুটি, কালো ছোলা
  • বেল, ডালিম, আম, কাঁঠাল

ফলিক অ্যাসিড একটি পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন। এটি শরীরে জমা থাকে না, তাই প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ফলিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। প্রতিদিনের চাহিদা মেটাতে এই খাবারগুলো নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস করুন।

কেন ফলিক অ্যাসিড গুরুত্বপূর্ণ?

ফলিক অ্যাসিড সঠিক রক্তকণিকা উৎপাদনে সাহায্য করে এবং গর্ভাবস্থায় শিশুর সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করে। এটি নার্ভাস সিস্টেমের স্বাস্থ্য বজায় রাখে এবং রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করে।

ফলিক অ্যাসিডের খাবারের তালিকা ও স্বাস্থ্য উপকারিতা সংক্রান্ত এই তথ্যগুলো প্রতিদিনের স্বাস্থ্যকর খাদ্য পরিকল্পনা তৈরিতে আপনাকে সাহায্য করবে।

প্রেগনেন্সিতে ফলিক অ্যাসিড

গর্ভাবস্থায় মায়ের ও সন্তানের পুষ্টির চাহিদা পূরণের জন্য নানান রকম খাবার প্রয়োজন। তবে সবসময় শুধু খাবার খেয়েই এই পুষ্টি চাহিদা পূরণ হয় না। ফলিক অ্যাসিড তার মধ্যে অন্যতম। এটি মা ও শিশু দুজনের জন্যই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি পুষ্টি উপাদান।

গর্ভাবস্থায় ফলিক অ্যাসিডের উপকারিতা

সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করা অবস্থাতেই ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ শুরু করা উচিত। এটি শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি এবং মস্তিষ্কের সঠিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া, এটি গর্ভের শিশুকে নানা ধরনের জন্মগত ত্রুটি যেমন নিউরাল টিউব ডিফেক্টস (Neural Tube Defects) থেকে রক্ষা করে।

গর্ভাবস্থায় প্রতিদিনের ফলিক অ্যাসিডের প্রয়োজনীয়তা

গর্ভাবস্থায় প্রতিদিন মায়ের প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিডের প্রয়োজন। কিন্তু শুধুমাত্র খাবার থেকে এটি পাওয়া বেশ কঠিন। তাই চিকিৎসকেরা গর্ভাবস্থায় ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

  • সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনার সময় থেকেই ফলিক অ্যাসিড খাওয়া শুরু করতে হবে।
  • এটি গর্ভধারণের ১২তম সপ্তাহ পর্যন্ত নিয়মিত গ্রহণ করা উচিত।

গর্ভাবস্থায় ফলিক অ্যাসিড কিভাবে কার্যকর?

গর্ভধারণের প্রথম সপ্তাহগুলোতে গর্ভের শিশুর ব্রেইন এবং স্নায়ুতন্ত্রের দ্রুত বিকাশ হয়। তাই প্রথম তিন মাস ফলিক অ্যাসিড নিয়মিত খাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি গর্ভের শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সাহায্য করে এবং বিভিন্ন জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে সহায়তা করে।

আয়রন-ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট সঠিকভাবে খাওয়ার নিয়ম

  • আয়রন-ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট খালি পেটে খেলে সবচেয়ে ভালো কাজ করে।
  • খাবার গ্রহণের এক ঘণ্টা আগে বা দুই ঘণ্টা পর এটি খাওয়া উচিত।
  • যদি খালি পেটে ট্যাবলেট খেতে অস্বস্তি হয়, তাহলে খাবারের পরপরই খাওয়া যেতে পারে।
  • আয়রন ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেটের সাথে অ্যান্টাসিড বা ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খাওয়া উচিত নয়। এতে আয়রনের কার্যকারিতা কমে যায়।
  • অ্যান্টাসিড বা ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট গ্রহণের কমপক্ষে দুই ঘণ্টা পরে আয়রন ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট খেতে হবে।

ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেটের উপকারিতা এবং গর্ভাবস্থায় প্রভাব

ফলিক অ্যাসিড গর্ভাবস্থায় মা ও শিশুর জন্য অপরিহার্য। এটি রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করে এবং গর্ভধারণকালীন জটিলতার ঝুঁকি কমায়। গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ এবং সুস্থ গর্ভাবস্থার জন্য এই ট্যাবলেটের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

folic acid tablets for pregnancy

ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট

ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট এবং ফলেট যৌগ মানবদেহের প্রয়োজনীয় ভিটামিন বি৯ এর অন্যতম উৎস। আমাদের শরীর যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন বি৯ উৎপাদন করতে না পারে তখন এই ওষুধটি খেতে দেয়া হয়। এটি পিউরিন ও পিরিমিডিন উৎপাদন করতে কাজ করে। গর্ভাবস্থার শুরু থেকে এই ওষুধ সেবন করলে শিশুর জন্মগত ত্রুটি হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশেই কমে যায়। তবে এই ওষুধটি খাওয়া শুরু করার আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। আপনার শারীরিক অবস্থার উপর ভিত্তি করে ডাক্তার আপনার জন্য সঠিক ডোজ নির্ধারণ করে দিবেন।

পরিশেষে বলবো, ফলিক অ্যাসিড মানব দেহের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটি পুষ্টি উপাদান। আমাদের প্রতিদিনকার খাদ্যের মধ্যে এই পুষ্টি উপাদানটি থাকলেও অনেক সময় আমরা এর ঘাটতিতে ভুগে থাকি। যার
ফলে অনেক সময় আমাদের দেহে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। তবে গর্ভাবস্থায় গর্ভের সন্তানের কথা চিন্তা করে সঠিক পরিমাণে ফলিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সেবন করতে হবে।